লাল টিপ – মাসুমা

চোর, বাটপার বা ঈমানদার সে যেই হোক না কেন একজন মুসলমান মাত্রই নামায তারকাছে ফর্জ। প্রতিনিয়তই লিখতে ইচ্ছা করে কিন্তু লেখাটা হয়ে ওঠে না। লিখার জন্য কিছু একান্ত মুহুর্তের প্রয়োজন আছে, সে সময়টা হবে একান্তই আমার কোন রকম চিন্তা বা বাইরের ঘটনা আমার মনে আলোকপাত করবে না। সে সময়টা যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে আর শব্দকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দিয়েছে। একজন ব্যক্তির মানসিক বিকাশের জন্য বইয়ের তুলনা নেই। যারা বই পড়েন বা ফুলকে ভালোবাসেন আর মনের দুঃখে বনে বাদারে ঘুরে বেড়ায় তাদেরকে বাইরের চোখ দিয়ে দেখতে বিষন খারাপ কিছু মনে হলেও যে মানুষ এই তিনটার একটিকে ভালোবাসেন তার জন্য অন্যায় করাটা দুঃসাধ্য। আমার এ বিষয়ে এতোটা লিখবার উদ্দেশ্য হচ্ছে জন সচেতনতা। আমাদের সমাযে যেভাবে ড্রগসের ব্যবহার বেড়ে চলছে বিশেষ করে ইয়াবার আগ্রাসন এতে করে আপনার সন্তানকে এই পথ থেকে দূরে রাখতে, তার স্বাস্থ্য সচেতনতা যথা থাকে জিম করতে উৎসাহিত করা, পড়ার বইয়ের পাশাপাশি আউট বই পড়ানো, প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে সম্যক ধারনা দিতে ফুলের তাৎপর্য আর ভাষার ভিতরে লোকিয়ে থাকা অকৃত্রিম ভালোলাগার স্বাধ আস্বাধন করতে থাকে অবশ্যই উসাহিত করতে হবে। যেহেতু আপাতত লিখাটা বন্ধ তাই শুক্রবারের দিনে পছন্দের কোন লিখাকেই টাইপ করে অনলাইনে সবার পড়ার সুযোগ করে দেবার ইচ্ছায় আমার আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। ভূমিকা দির্ঘায়িত করে বিরক্তি বাড়াচ্ছি না কারন আজকের উপন্যাসটা অনেকটাই বিশাল পরিধির।

এক.
ডা…. কতার আপায় আইছিল।’
স্বামীর রক্ত-চক্ষুর সামনে তোতলাতে-তোতলাতে স্বীকার করলো শাফিয়া।
‘ক্যান আইছিল… ডাকছিলি তুই?’
‘না, ডাহি নাই… এমনেই আইছিল।’
‘আবারও মিছা কথা?’
‘বিশ্বাস করেন, আমি ডাহি নাই… আসলে হইছিল কি জানেন… গেলবারের মরা বাচ্চাডা তো হে-ই খালাস করছিল… তাই কইতাছিল আর বাচ্চা না নেওনের কতা।’
‘বাচ্চা না নেওনের কতা মানি? বাচ্চা নেওন না নেওনে আমাগোর হাত কি… যে হে বুঝাইতে আইবো?’
‘না… মানি…’ আবারও তোতলায় শাফিয়া, ‘… কইতাছিল… ওই… ওই… আপনে তো জানেন বড় বু করছে… আমগো ঘড়ে তো আল্লায় দিলে ছয়খান পোলা-মাইয়া আছে, দুইখান মরল… তা ছাড়া, পোলা-মাইয়া প্যাডে লইয়া মাটি কাটনের কাম করন কঠিন… তাই লাইগেশনের…’
‘লাইগেশন’ শব্দটি বুকে সাহস নিয়ে উচ্চারণ করলেও বাদবাকি বাক্যটা শেষ করতে পারলো না শাফিয়া। তার আগেই হুঙ্কার ছাড়লো তার স্বামী ইবাদৎ মোল্লা, ‘আর একবার ওই নাফরমানি কামের কথা মুখে আনছস তো… বুজোস… পিডাইয়া এক্ষেবারে মাইরা লা’মু!’
তার পরে আরও অনেক কড়া কথা শুনতে হলো, কিন্তু আর টুঁ শব্দটি করলো না শাফিয়া।
পরের দিন স্বামী ইবাদৎ মোল্লার মনে হলো, বউকে এভাবে ধমক দেয়াটা মোটেই উচিৎ হয়নি তার। বউ তো আর বলেনি যে লাইগেশন করবে। ডাক্তার বলেছে, তাই অনুমতি চেয়েছে। এখানে বউয়ের দোষ কোথায়? তা ছাড়া, আজ রাতে বউয়ের কাছে যাবার বেশ তাগাদাও অনুভব করছে সে। রাতে ঘুমাবার আগে তাই বউয়ের সাথে বেশ ভালোভাবে আলাপ-সালাপ করলো। শাফিয়া ভাবলো, মন ভাল স্বামীর, এখন হয়তো বুঝিয়ে বলা যায় ব্যাপারটা। নতুন করে প্রসঙ্গটা তুলল শাফিয়া। রাগ করলো না ইবাদৎ মোল্লা। বউকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।
জান্নাতী নারীরা কীভাবে স্বামীর অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে জন্ম দিযেছে সন্তানের, পুত্র-কন্যায় ভরে দিয়েছে ঘর, কীভাবে তারা গর্ভবতী অবস্থায় নিজ হাতে গম পিষে সংসারে আয়-রোজগার করেছে; অথচ জীবনের প্রতি, ধন-সম্পদের প্রতি ছিল না কোনও মোহ। স্বামী যখনই তাদেরকে আহবান করেছে শয্যায়, তখনই সাড়া দিয়েছে। সারাদিন রোজা রেখে স্বামীর সেবা করেছে রাতে, অথবা নামাযের পাটিতে পার করেছে দীর্ঘ রাত… এগুলো শুনতে-শুনতে শাফিয়ার চোখে নেমে এল গাঢ় ঘুম।
ভোরবেলা আজান শোনে উঠতে হবে, সংসারের কাজগুলো গুছিয়ে রেখে ঝড়ি-কোদাল হাতে বের হতে হবে- অনেক ঘুরে ফিরে মাটি কাটার চাকরিটা পেয়েছে শাফিয়া। দেরি অথবা অনুপস্থিতি বরদাস্ত করবে না সুপারভাইজার। দেরি করলে অনুপস্থিতি দেখিয়ে পকেটে পুরবে বেতনের টাকাটা। বিকেলে ঘরে ফেরার সময় দুটো শাক-পাতা বা কচুর লতি অথবা ছোট মাছ নিযে বাড়ি ফিরবে শাফিয়া। কাজের ফাঁকে, ওগুলো ধরেছিল কচু পাতার মুড়ে। এরপর সন্ধ্যায় গিযে নিয়ে আসবে মাঠে বাঁধা গরু-ছাগলগুলো। দিন গেল, মাস গেল, তারপর একের পর এক বছর, ছকে বাঁধা জীবন পার করলো শাফিয়া। গ্রীষ্ম আসে, আসে বৈশাখি ঝড়, উড়ে যায় শাফিয়ার ঘরের চালা। তবুও আবার ঘর বাঁধে ও, কেটে যায় জীবন। ঝর-ঝর বর্ষায় যখন পাট খেতের গাছ তর-তর করে বেড়ে ওঠে, ও-পাড়ার পাচির মা পাশের বাড়ি গল্প করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে, শাফিয়া তার চালে ফুটো সারাই করে তালপাতা গুঁজে। নতুন বানের জলে ভেসে আসা ছোট সব মাছ ধরে চচ্চরি রাঁধে পুঁই ডাঁটা দিয়ে। শরতে নদীর তীরে কাশফুল দোলে, পূর্ব -পাড়ার হিন্দুরা মেতে ওঠে শারদীয় উৎসবে, শাফিয়া মাটি কাটে, ভাত রাঁধে, প্রসব করে সন্তান। হেমন্তে যখন মাঠে-মাঠে ধান পাকে, শাফিয়ার ভাগ্য বদলায় না, ওর কোনও জমি নেই। স্বামী কারও বর্গাচাষীও নয়।শাফিয়ার ঘরে ওঠে না কোনও ফসল, ওর মেয়েদেরকে পাশের বাড়ি থেকে ফসল তুলতে ডাকে, দিন চুক্তি মাইনে দেয়।
শীতকালে যখন জীবজগৎ শিউরে ওঠে, কেউ গরম লেপের তলে আয়েশে ঘুমায বেলা পর্যন্ত, শাফিয়া ওঠে সেই ভোরে। ঘরে-ঘরে যখন খেজুর গুড়ের পিঠের আমেজ, তখন শাফিয়া টাকা ধার করে কিনে আনে এক কলসি রস, অথবা গুড়। পরিবারের সবার ভাগে পড়া গুটিকতক পিঠে তারিয়ে-তারিয়ে খাওয়া দেখে ও। নিজের ভাগে হয়তো জোটে না কিছুই।

বসন্তে যখন দখিনা বাতাস বয়, শাফিয়া তার ঘরের লেপকাঁথার স্বল্পতা আর টের পায় না। গাছের নতুন কচি পাতা দোলে, কোকিল গান গায়, শাফিয়া মাটি কাটে, শাফিয়া ভাত রাঁধে, শাফিয়া জন্ম দেয় সন্তানের, পালন করে সংসারের গুরু দায়িত্ব। স্বামী জাগতিক কাজকর্মকে দুনিয়াবী কাজ ভেবে দিন-রাত কাটায় নামায-রোজা করে। মসজিদে চোখ বন্ধ করে জিকির করে ঘন্টার পর ঘন্টা, খিদে লাগার আগ পর্যন্ত। শাফিয়াকে তৈরি থাকতে হয় সেই মুহূর্তের জন্য। খাবার শেষে স্বামী যেন না বলে ,‘দুফ্রে খাওনের পর মিডাই খাওন সুন্নত, আছেনি?‘
শাফিয়া প্রস্তুুত রাখে বিনা দুধের একটু ক্ষীর বা হালুয়া। রান্নার সময় খাবারের গন্ধে ছোট-ছোট অবুঝ ছেলে-মেয়েরা না দেখে ফেলে সেদিকে শাফিয়ার সজাগ দৃষ্টি। তবু মাঝে-মাঝে টের পায় বাচ্চারা। বাপের খাবারের দিকে দূর থেকে তাকায় জুল-জুল করে। খাওয়ার সময় কথা বলা গুনাহ, তাই নির্বিকার চিত্তে অখন্ড মনোযোগে চেটেপুটে খেয়ে নেয় ইবাদৎ মোল্লা। খাবার শেষ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যখন রান্নার প্রশংসা করে, তখন অবুঝ সন্তানের ক্ষুধাতুর লোলুপ দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে খোশি হয় শাফিয়া। কিন্তু মাঝে-মাঝে যখন স্বামী বলে,‘নাহ্, রান্ধনের হাত আছে তোমার! বিনা দুধেই এমন স্বাধ কইরা রানছো, দুধ হইলে না জানি তুমি কী রানতা।‘ -তখন দুধের ঘাটতি থেকে আরও কোন ঘাটতি দরা দেয় চোখে। স্বামীকে সে সন্তুষ্ট করতে পারলো না!
সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর স্বামী যখন জৈবিক প্রয়োজনে কাছে ডাকে, তখন ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া শরীরের বিদায়ী যৌবনকে প্রানবন্ত করে তুলতে প্রানপণ চেষ্ঠা থাকে ওর। গর্ভে ধারন করে সন্তান, জন্ম দেয়। জোগায় তাদের মু্খের প্রতিদিনের আহার্য। শাফিয়ার স্বামী ভূমিহীন ছিল, তা নয়। বরং যে জমিগুলো ছিল, তাতে টেনেটুনে চলে যেত সংসারটা। কিন্তু বছর সাতেক আগে জমি বিক্রি করে প্রবিত্র হজ্ব পালন করেেএসেছে ইবাদৎ মোল্লা।
তার স্বামী হজ্বে যাচ্ছে, সে আনন্দে শাফিয়াও সন্তানের ভবিষ্যৎ-চিন্তা ভুলেছিল। স্বমী যখন হজ্ব সেরে তাকে শোনাল সেই প্রবিত্র ভূমির বর্ণনা, তখন সে শুনল মন্ত্রমুগ্ধের মত। ‘জানো, শাফিয়া, যে পরিমান খাওন তারা ফালাইয়া দ্যায়… তা খাইয়া আমাগো দ্যাশের ব্যাকে বাচতে পারতো… তাও তাগো দেশে কোন অভাব নাই… রহমতের দেশ হইলে যা অয় আরকি? …কুরবানীর পশুগুলান খাওনের লোক নাই… সব মাটি চাপা দিয়া দেয়।‘
অবাক হয় শাফিয়া! ‘স…ব?‘
পাশের বাড়ির মাংস রান্নার গন্ধে ছোঁক-ছোঁক করা সন্তানের মুখটা কেন জানি তখন মনে পড়ে।
‘হ। … খাইবো কেডা? তাগো তো অভাব নাই। আর, তা ছাড়া আল্লার কাছে কোরবানীর গুছ আসল না, আসল অইল গিয়া নিয়ত…‘
‘ও…হ,‘ শুকনো হাসি দিয়ে সম্মতি জানায় শাফিয়া। প্রবিত্র ভূমি থেকে আনা জিনিসগুলো কাচের বয়ামে রাখতে-রাখতে শাফিয়া সে দেশের গল্প শোনে। কথায় কথায় বাড়ে রাত। উত্তুরে শীতের বাতাস শিস কেটে ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢোকে ঘরে। চমকে ওঠে শাফিয়া। ওঠা যেন শীতের হাওয়া নয়। দুঃখের হাওয়া। সামনের দিনগুলো চলবে কি করে? যাবার আগে সন্তানদের বলে গিয়েছিল ইবাদৎ মোল্লা, সে ওই দেশ থেকে অনেক কিছু আনবে তাদের জন্য।
ঘুম থেকে উঠেই ‘বাজান কি আনছে, মা? বলে আকুল হল ছোট ছেলেটা।
‘র, দিতাছি।‘
শাফিয়া প্রবিত্র ভূমির প্রবিত্র বালিকণা ছুঁইয়ে দেয় সন্তানের বুকে-পিঠে। শুকনো উঠের গোস্তের তাবিজ বেঁধে দেয় গলায়। ঝিনুকের চামচে তুলে খাওয়ায় প্রবিত্র জমজম কূপের পানি। শুকনো খোরমা আধখানা গুঁজে দেয় মুখে। ছেলে হতাশ দৃষ্টিতে তাকায় মায়ের দিকে। ‘মজা লাগে না, মা…‘
নিষ্পাপ শিশুর মন অবুঝ। এর গুরুত্ব কি বোঝে সে?

দুই.
‘তারপর বইন… তুমি রাজি হইলা তাগো কথায়?‘
‘রাজি না হইয়া কি করতাম, বইন… বড় পোলাডা যে যায়-যায়। অনেক ট্যাহার কাম… তাগো কাছ থেইকা ট্যাহা আইনা পোলাডার চিকিৎসা করালাম… ভাল হইলো। … আমার তহন সাত মাস চলতাছিল… এক রাইতে পোলার বাপ আর আমি মিল্যা পোলাডারে লইয়া পলাইয়া গেলাম। … কেডা জানতো তাগো লোক রাইত দিন পাহাড়া দ্যায়!
‘আট-দশজন মিল্যা ধইরা ফালাইল। ওর বাপরে মাইরা ফালাইলআর আমারে ধইরা আনল পোলাসহ।‘
‘তারপর?‘
‘আর কি, বইন… চুক্তি মত ছোট পোলাডা জন্মের জন্য তাগো হাতে তুইলা দিলাম। … তারা হাড়ির ভিত্রে রাইখা-রাইখা পঙ্গু বানাইয়া দিল। হেই পঙ্গু পোলা লইয়া অহন আমি ভিক্ষা করি… দিন শেষ হইলে ভিক্ষার ট্যাহা তাগো হাতে গুইজ্যা দেই… আমি পাই মাসকাবারি ট্যাকা… তয় পোলা বড়ডা আমার ইস্কুলে যায়। …তুমি, বইন, আইজ বড় বাচা বাইচ্যা গ্যাছ… হ্যাগো কাছ থেইকা পলাইয়া আইতে পারছ… নইলে আর জীবনেও পার পাইতা না।‘
এ বস্তির ভিক্ষুক রাবেয়ার মুখে ভিক্ষুক চক্রের বীভৎসতার কথা শুনে জমে পাথর হয়ে যায় শাফিয়া।
‘ওই, হালিমা, ঘুমাইলাম আমি…‘ বলে ল্যাংড়া বাচ্চাসহ চৌকির তলে বালিশ নিয়ে ঢুকল রাবেয়া,‘তর মাইয়ারে আইজ পলিথিন দিয়া পাইত্যা দিস, বইন… মাগো, কাইল ক্যামনে মুইতা ভাসাইল… পড়ছে গিয়া এক্কেরে আমার মুখত্।‘
কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল রাবেয়া। ঘুম এল না শাফিয়ার চোখে। সে খোব গরীব। রাস্তার মাটি কাটে। কিন্তু জীবনের এত কদর্য রুপ আজ পর্যন্ত তার চোখে আগে কখনও ধরা পড়েনি। এক লোক তাকে জানিয়েছিল, তাকে বেশি আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে দেবে। বিশ্বাস করে তার পিছু নিয়েছিল শাফিয়া। কিন্তু জানতে পারেনি, ভিক্ষুকের দালাল সে। নিয়ে গিযেছিল তার মহাজনের কাছে। সেখানে তার শর্ত শুনে আর দাঁড়াবার সাহস করেনি শাফিয়া। প্রানভয়ে পুত্র সন্তানকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল। ছেলে এখনও মায়ের কাছে প্রশ্ন করছে, ‘হাত দুইডা আমার হাচাই কাইট্যা ফালাইব, মা?‘
‘না, বাজান, কাটতো না। আমি থাকতে তর গায়ে কেউ হাত দিতে পারতো না, বাজান।‘
আশ্বাস পেয়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমায় ছেলে।
এই বস্তি এলাকার নোংরা ভাপসা গন্ধ আর জীবনের যন্ত্রণা সব যেন একাকার হয়েছে মিলেমিশে। এত কদর্য পরিবেশে মানুষ থাকতে পারে, মানুষের জীবনচিত্র এত নির্লজ্জ হতে পারে- জানা ছিল না শাফিয়ার। নোংরা পানির উপরে বাঁশের মাচান পেতে ছোট-ছোট খুপরি ঘর। মাচানের ফাঁক গলে চোখে পড়ে নিচের কদর্য দৃশ্য। মানুষের মল, মরা কুকুর-বিড়ালের ছানা, এমনকি গর্ভপাতের অপরিপক্ব সন্তান। রাতের গভীরে দুলে ওঠা মাচান জানান দেয়, রাতজাগা দম্পতির বর্তমান অবস্থান। সকালে কবিরের বাপ আর পাশের ঘরের মাজেদার মা গোসল করে একই কলতলায়।
‘ভাবি, ডেইলি য্যামনে গোসল করতাছ, তোমার দেহি ঠান্ডা লাইগা যাইবো গা।‘ কবিরের বাপের এই অশালীন ঠাট্রায় মাজেদার মা খুঁজে পায় তার স্বামীর পৌরষের বন্দনা। খুশি হয়ে সে আরেকটা সানসিল্ক মিনিপ্যাক ছাড়ে, ফেনাতুলে শ্যাম্পু করে চুলগুলো। এর মাঝেও চলে আরও কিছু সরস আলোচনা।
বদনা হাতে ছালা ঘেরা পায়খানায় ঢোকার আগে ‘ভিত্রে আছেনি কেউ?‘ বলে প্রশ্ন ছোঁড়ে আগ্রহী পক্ষ।
ভেতর থেকে গলা খাঁকারি দিলে বোঝা যায়, সে নারী। পুরুষ তাকলে হয়তো সাড়া দেয়, ‘হ,আমি লোকমান… আর দুই মিনিট লাগবো, রফিক ভাই।‘ পর্দার দু‘পাশের কুশল বিনিময়ে পার হয় পাঁচ মিনিট। আলোচনা স্থগিত রেখে অস্থির হয় এ পাশের রফিক মিয়া, ‘কি রে, বাইরাবি না আইজ? …ওই, হালা, মরা গরু খাইছসনি? অত গন্ধ আহে ক্যা?‘
‘আর কইও না, রফিক ভাই… ওই আবুইল্যা কাইল খাসির কাবাব খাওয়াইল… হ্যার পর থাইক্যা এই দশা… খাসি না শিয়াল আছিল কী জানি…‘
সকালের কর্মযন্জ সেরে সবাই যেন আতশবাজির ফুলকির মত ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। ওদের ছোট-ছোট সন্তান সারাদিন ঘুরে বেড়ায় বেওয়ারিশ কুত্তার মত। কারণে-অকারণে করে ঝগড়া। একজন আরেকজনকে ‘তর মায়েরে…‘ বলে গালাগাল দেয় অবলীলা ক্রমে। আট-দশ বছরের এতিম ছেলে ভাঙারি মালিকের পোষা পাখি। ছালা কাঁধে বেরিয়ে পড়ার আগে গাঁজার পুঁটলি তাদের হাতে তুলে দেয় মালিক। একটু দম নিয়ে নেবে তারা, থাতে শক্তি পাবে ভাঙারি কুড়ানোর। মালিকের লাভ… এক সময় নেশার টাকার জন্য চুরি-চামারি করতেও দ্বিধা থাকবে না ওদের। জমবে তার গাঁজা বিক্রির আখড়া ও ভাঙাড়ির ব্যবসা।
এই নোংরা, অমানবিক, নির্লজ্জ, পূতিগন্ধময় পরিবেশে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে না শাফিয়া। কল্পনাগুলো সব আকাশের তাঁরা ওর! অসংখ্য, অগণিত, ঝলমলে, মনোহর। আর বাস্তবতা হলো সূর্য , ঝলসে যেতে হয়, অথচ বসবাস তাকে নিয়েই। শাফিয়া যখন লোকমুখে ঢাকা শহরে কোনও ভিক্ষুকের আয়-রোজগার শুনে এসেছিল, ভাবতেও পারেনি তার বাস্তব রুপ কতটা ভয়ঙ্কর।
‘বেশি কিছু না, বু, তুমিও গরিব, আমিও গরিব… আমরা আমরাই। খালি আমার পোলাডারে অ্যাকখান ভ্যান কিনা দিয়ো… কামাই কইরা তোমার মাইয়ারেই খাওয়াইব।‘
মাটি কাটুনি রহিমার কথা শুনে এক কথায় ‘হ্যাঁ‘ বলে দিয়েছিল শাফিয়া, কিন্তু কোত্তেকে টাকা আসবে, তা একবারও ভাবেনি। রহিমা বিধবা, একমাত্র ছেলে, জোয়ান। গায়ে গতরে বেশ। ভাল ছেলে বলেও সুনাম আছে। একদিন ওর বাড়িতে এসে ওর মেয়ে ফাতেমার শান্ত নিরীহ চেহারা দেখে, ওর হাতের রান্না খেয়ে এক নজরে ছেলের বউ হিসাবে ওকে পছন্দ করে ফেলে রহিমা। যৌতুক হিসাবে বেশি কিছু চায়নি, একটা ভ্যান। বরযাত্রি খাওয়াতে হবে না!
শাফিয়া এতেই খোশি।
কিন্তু কোথায় পাবে টাকা?
দশ হাজার!
ভাইদের কাছে হাত পাতবার উপায় নেই। বাপের কাছ থেকে পাওয়া নিজের ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে আনায় রাগ করে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ভাইয়েরা। পাশের গাঁয়ের ছমিরের বউ প্রতি রোজায় ঢাকায় ভিক্ষা করতে যায়, আয়-রোজগার নাকি ভালোই। এবার শাফিয়া গিয়ে তাকে ধরল। সুপারভাইজারের কাছ থেকে অবৈতনিক ছুটি নিল এক মাসের। সঙ্গে করে নিল চার বছর বয়েসি শিশু সন্তানকে। আসার আগে স্বপ্ন দেখে এসেছে শাফিয়া, হাত পাতলেই শুধু খুচরো-খুচরো নোট পড়বে হাতে, দিন শেষে হবে এত্তগুলো টাকা! আঁচলে গিঁঠ দিয়ে বেঁধে রাখবে। তারপর মাসশেষে মুঠি-মুঠি টাকা নিয়ে ফিরবে ও বাড়ির পথে। কিন্তু ঢাকা শহরে পা রেখে ধাক্কা খেয়েছে। ছমিরের বউ দিনকাবারি টাকা চায়, নইলে ওকে ভিক্ষা করতে দেবে না। ট্রাফিক পুলিশের নিত্য ভাগ আছে। টাকা দিয়ে আপোষ করতে হবে পুরানো ভিক্ষুকদের সঙ্গে। অন্যান্য চাঁদাবাজরা তো আছেই। এসব সামলিয়ে সাফিয়া যখন দিন শেষে ছমিরের বউয়ের সঙ্গে ফেরে ডেরায়, বস্তির ওই খুপরি ঘরে, হাতে থাকে যৎসামান্য টাকা। সে আর তার ছেলের খাবার খরচ বাদে যা থাকে, তার পরিমান রীতিমত হতাশ করে শাফিয়াকে। তবু হাল ছাড়ে না। বেশি রোজগারের আশায় অন্যের উপর ভরসা করতে গিয়ে কী বিপদেই না পড়তে যাচ্ছিল আজ। তবে পনেরো রোজা থেকে আয়-রোজগার একটু বাড়লো শাফিয়ার।ঈদের দু‘একদিন আগে ওর হাতের সন্ঞিত টাকা ওকে খোশি করতে না পারলেও হতাশ করল না একেবারে।
তেরো হাজারের কিছু বেশি। শাফিয়া পুরানো শাড়ির দোকান ঘুরে কিনল বিয়ের একটা শাড়ি। আর কিনল একটা লাল টিপ। মেয়েটা তার ভীষন পছন্দ করে লাল টিপ। লাল টিপ হারাম, তাই বাপের ভয়ে লুকিয়ে একদিন পরেছিল। তবু বাপের হাতে ধরা পড়ে সে, কি মারটাইনা খেল মেয়েটা। শাফিয়া মেয়ের বিয়ের অজুহাতে ঠিকই ওর কপালে পরাবে একটা লাল টিপ। দুটো ভাসা-ভাসা চোখের ওপরে টানা ভ্রুর মাঝে মানাবে খোব। দোকানীর কাছে একটা চুমকি-পাথর বসানো টিপের দাম পন্ঞাশ টাকা শুনে আঁতকে উঠলেও, টিপটা কিনেছে শাফিয়া। এটা নাকি বিয়ের টিপ। মেয়ের শখের কাছে পন্ঞাশ টাকা খুব সামান্যই মনে হল ওর।

তিন.
রোদে বেশি ঘোরাঘুরি করতে বারণ করেছে ফাতেমার হবু স্বামী লালচান। ওকে নাকি দেখতে পরীর মত লাগবে, যদি রোদে না ঘোরে। আর বিয়ের পর ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনে দেবে নিয়মিত। আর ওই লাক্স সাবান। তাহলেই ফর্সা হয়ে উঠবে ও!
আরও অনেক কিছু বলেছে ওর হবু স্বামী। রাজিয়া তাকে যতই চাপাচাপি করুক, কিছুতেই সে এসব কথা বলবে না। ইস! লজ্জা করে না?
আজ দুপুরে রান্না প্রায় শেষ, এমন সময় পাশের বাড়ির রাজিয়া ডাক দিল তাকে। ওদের বাড়ির মোবাইলে কল করেছে ফাতেমার হবু স্বামী। শুনে চমকে ওঠে ফাতেমা। হাতের কাজ দ্রুত মেজ বোনের হাতে গছিয়ে ছুটে গেলো।
লালচানের কথায় বিস্ময়ে, লজ্জায় একাকার ফাতেমাকে পরে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলো বান্ধবী রাজিয়া, ‘ক’ না কী কইল তোর…’
‘যা… কমু না। বাইত যামু।’
‘আরে, যাইস… হুন, আইজ ”কেয়ামত থাইকা কেয়ামত” সিনেমা হইব… ওই যে… যে নায়কডারে হের বউ মাইরা ফালাইল।’
‘আব্বায় জানলে…’
‘জানবো না… মসজিদে আছে… রান্ধনের কাম তো মাইজা’রে দিয়াইছস।’
বাপের ভয়ে আর পাপের ভয়ে টেলিভিশন না দেখা ফাতেমার মন কেন জানি নেচে উঠল আজ।
রাজিয়ার সঙ্গে আর বাদানুবাদ না করে বসে পড়ল এক পাশে। ও আগেও সিনেমাটার গল্প শুনেছে। কিন্তু আজ কিসের সালমানশাহ্ আর মৌসুমি- ষোড়শী ফাতেমার ঘোর লাগা চোখ ওদেরকে দেখতে পেল না। ও দেখল মৌসুমি নয়, নিজেকে। সালমানশাহ্ আসলে নয়, ওই তো লালচান! ওদের প্রতিটি গানের কথা, প্রতিটি ভঙ্গিমায় জড়িয়ে আছে ওরা দু’জন!
গতকাল ফোন করেছিল ওর মা। আজ রাতের গাড়িতে আসবে। ভ্যানের টাকা জোগার হয়েছে কিনা বলেনি। আচ্ছা, যদি জোগার না হয়! তা হলে? লালচান ওর মায়ের অনুমতির তোয়াক্কা না করে ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবে কি? দূরে… অনেক দূরে। শুধু ও আর লালচান। লালচান আর ও।
‘বু, তোমারে আব্বায় ডাকতাছে।’
ছোট ভাইয়ের ডাকে হৃৎপিন্ডটা একলাফে গলার কাছে চলে এল ফাতেমার। এক ছুটে বাড়ির আঙ্গিনায় আসতেই, ‘কই গেসিলি ক’? বাইত আইয়া দেখলাম না! গোসল সাইরা আইয়াও দেহি তুই নাই!’
ফাতেমা কোনও কিছু বলার আগেই ওর হয়ে জবাব দেয় সাত বছর বয়েসি ছোট ভাইটি। ‘বু টিভি দেখতে গেছিল, রাজিয়াগো বাইত।’
‘ক্-কী দ্যাখতে গেছিলি… হারামী, ছেনাল মাইয়া… আইজ তোর একদিন কি আমার একদিন…’
চুলের মুঠি ধরে আঙ্গিনায় ফেলে ইচ্ছেমত লাথি-চড় মেরেও খায়েস মিটল না ইবাদৎ মোল্লার। গালাগাল বকতে-বকতে ছুটে গেল রান্নাঘরে। ‘নাফরমানী কাম কইরা আইছস। …তর হাতের রান্ধন খাওয়া পাপ, জানস?
… আহুক তর মা! মাগীরে তো তালাক দিমুই, লগে তরেও বাইর করুম বাইত থেইকা…’
মুখের সঙ্গে চলে হাত। রান্নাঘরের ভাত তরকারী একে-একে ছুঁড়ে ফেলে উঠোনে।
আজন্ম কষ্ট সয়ে আসা ফাতেমা রা করে না। এমনকি কড়াই সহ গরম ডাল ছুঁড়ে মারে গায়ে, তখনও না।
আশপাশ থেকে ছুটে আসা পাড়া-প্রতিবেশীকে অবাক করে দিয়ে নীরবে উঠে দাঁড়ায় ও। তারপর ঘরে গিয়ে দরজা লাগায়। মনের আক্রোশ মিটিয়ে ইবাদৎ মোল্লা হন-হন করে চলে যায়।

চার.
কোরবানীর গরুর মত একটা কাগজের মালা জড়িয়ে দিয়েছে ভ্যানে; শাফিয়া ছেলেমেয়েদের এমন কান্ড দেখে হেসে খুন। দুলাভাইয়ের এই ভ্যানে চড়ে ওরা কোথায়-কোথায় যাবে তা নিয়ে রীতিমত তর্ক জুড়েছে। পোলাও মাংসের গন্ধে ম-ম করছে বাড়ি। মেয়ে ফাতেমাকে হলুদ মেখে গোসল করিয়ে ফেলেছে এর মাঝেই। পুরানো শাড়ি হলেও পাড়া-প্রতিবেশী টের পায়নি। বরং দু‘একজন প্রশংসাও করেছে রীতিমত। ফাতেমার সাজগোজ শেষ হলে পাড়ার মেয়েদের বিস্ময় জাগিয়ে শাফিয়া ওর মেয়ের কপালে পরিয়ে দিল সেই পন্ঞাশ টাকার লাল টিপ।
‘এত সুন্দর টিপ তুমি কই পাইলা, মা?‘
মুগ্ধ মেয়ের মুখে আর কথা সরল না। এর মাঝে হৈ-চৈ করে উঠল বাড়ির ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা: চলে এসেছে নতুন জামাই!
হবু পুত্রবধূর মুখখানা তুলে ধরে মুগ্ধ রহিমা বলল, ‘কেডায় কয় আমার পুতের বউ কালা… রুপখানা দেখছনি? সুন্দরের মাতা খায়!‘
হবু বেয়াইয়ের মুখে মেয়ের প্রশংসা শুনে চোখে জল এল শাফিয়ার। ভুলে গেল বিগত মাসের ভিক্ষার লজ্জা। মেয়ের বিয়ের আনন্দ, মেয়ে-বিচ্ছেদের বেদনা, সব মিলে-মিশে একাকার হল মায়ের বুকে। সেদিন ওর কোল জুড়ে জন্ম নেওয়া মেয়েটি আজ বউ হয়ে যাচ্ছে অন্যের ঘরে। কাল থেকে আর ঘুম ভেঙ্গে দেখবে না ওকে। ছোট ভাই-বোনগুলোকে কোলে তুলবে না আর। হোগলার বেড়ায় গুঁজে রাখা চিরুনি নিয়ে বসবে না সন্ধ্যায় চুল বাঁধতে। একপেটা-আধপেটা খেয়ে বেড়ে ওঠা মেয়েটা তার স্বামীর ঘরে গিয়ে সুখ পাবে তো?
একটা লাল টিপ বাদে কোনও দিন কোন কিছুর জন্য বায়না না করা সেই মেয়েটার একটা সংসারের স্বপ্ন পূরণ হবে তো?
নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে শাফিয়ার মনে। কেমন যেন ঘোরের মাঝে চলে গেল ও।

‘ওই, খালা, ওঠেন! আয়া পড়ছেন তো!‘
ট্রাকের হেল্পারের ডাকে তন্দ্রা টুটে গেল শাফিয়ার। ঈদের আগে বাসে কোনও ঠাঁই না পেয়ে ট্রাকে চেপে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল শাফিয়া। এর মাঝে দিবা স্বপ্ন। অবশ্য, দিবাস্বপ্ন নাকি সত্যি হয়-হওয়ারই কথা। মাত্র চার দিন পর মেয়ের বিয়ে। যৌতুকের টাকা হাতে। আর হাতের মুঠোয় দরা লাল টিপ!
বাড়ি ফিরে ব্যাগ হাতরে টিপটা বের করে মেয়েকে দেখাবার ধৈর্য নেই শাফিয়ার। নিয়ে রেখেছে হাতের মুঠোয়।

পাঁচ.
শেয়াল-শকুনের আগে লাশের গন্ধ পায় পুলিশ। আত্নহত্যার লাশ বলে কথা! মা-বাবা জান থাকতে কাটাকুটি করতে দেবে না। পারলে সহায়-সম্বল সব পুলিশের হাতে গুঁজে দিয়ে পরম মমতায় আপনজনেরা আঁকড়ে ধরে থাকবে লাশটি।
আটাশ রোজার রাতে এমন খবর পেয়ে পড়িমরি করে ছুটে এসেছে পুলিশ। ঈদটা এবার ভালই যাবে তাদের। বেশি না, মাত্র দশ হাজার টাকা দিতে হবে তাদের। নইলে কিন্তু পোস্টমর্টেম!
তবে এত টাকার জোগার নেই এদের। রাতটা অপেক্ষা করতে হবে টাকার জন্য। কুছ পরোয়া নেই, ভাল সেহরীর ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায় রাতটা পার করে দিয়েছে তারা। বারান্দায় চাদরে ঢাকা লাশ, পাশে কোরআন পাঠরত নারী, পাড়া-প্রতিবেশীদের হা-পিত্যেশ; সঙ্গে ভালো সেহরী খেয়ে আর নগদ টাকার লোভে রাতটা খারাপ কাটেনি তাদের। ভোরের আলো ফুটতেই তাকিয়ে থাকল পথের দিকে। বারবার তাগাদা দিল গৃহকর্তাকে।
শাফিয়া উঠোনে পা রাখার আগে জানতেই পারল না, তার বুকের ধন মরে গিয়েও নিজের দাম দশ হাজার টাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখে গেছে।

**********************************************

ক‘দিন পর যার বিয়ে, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল তার বাপের হাতে টেলিভিশন দেখার অপরাধে প্রহৃত হয়ে ও অপ্রবিত্র উপাধি পেয়ে। বাঁশের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে অপমানের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি তার।
মেয়ের লাশ দেখে একবার চিৎকার করল শাফিয়া, ‘ওমা, তুই কই গেলি!‘ তারপরই মূর্ছা গেল।
শাফিয়ার হাতের ফাঁক গলে কখন পড়ে গেল লাল টিপ।
লাল টিপ নয়, পড়ে গেছে শাফিয়ার স্বপ্ন।
শাফিয়াদের হাতের মুঠো গলে চিরকালই স্বপ্নগুলো ঝরে যায়, ঝরে যায় অজান্তেই!

লেখাটি সংগ্রহিত
(রহস্যপত্রিকা, ডিসেম্বর২০১৫) সংখ্যা।

First PubLisH in Here

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s